‘ভোটের গাড়ি’র যাত্রা শুরু: নির্ভীক ভোটাধিকার ও নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা দিলেন ড. ইউনূস

বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামা বাজিয়ে যাত্রা শুরু করল বিশেষ প্রচারণামূলক কর্মসূচি ‘ভোটের গাড়ি’। সোমবার (২২ ডিসেম্বর) বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে থেকে এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। এই কর্মসূচির আওতায় ১০টি ‘সুপার ক্যারাভান’ বা সুসজ্জিত প্রচার যান দেশের ৬৪টি জেলা এবং ৩০০টি উপজেলায় পরিভ্রমণ করবে। এর মূল লক্ষ্য হলো আসন্ন জাতীয় নির্বাচন এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের ওপর আয়োজিত গণভোট সম্পর্কে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা এবং গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া।

একটি বিশেষ ভিডিও বার্তার মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা দেশবাসীর উদ্দেশ্যে এক বলিষ্ঠ বার্তা প্রদান করেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেন যে, এ দেশের প্রকৃত মালিক হচ্ছে জনগণ এবং আগামী পাঁচ বছর কারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন, তা নির্ধারণের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কেবল সাধারণ মানুষের হাতেই ন্যস্ত। ড. ইউনূস বলেন যে, ভোটাধিকার কোনো দয়া বা করুণা নয়, বরং এটি প্রতিটি নাগরিকের একটি মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের আগামীর ভবিষ্যৎ। তিনি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন যে, এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হবে যেখানে ভয়ের কোনো স্থান থাকবে না, থাকবে কেবল জনগণের নির্ভীক ও স্বতঃস্ফূর্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।

এই বারের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে আয়োজিত গণভোট। দীর্ঘ নয় মাস ধরে সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকের মাধ্যমে ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই ঐতিহাসিক সনদটি তৈরি করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, এই সনদটি দেশের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ও অগ্রগতির একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। যদি জনগণ এই সনদের পক্ষে তাঁদের রায় প্রদান করেন, তবে বাংলাদেশ আগামী বহু বছরের জন্য একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল পথে পরিচালিত হবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। তিনি বিশেষভাবে দেশের তরুণ প্রজন্ম, নারী ভোটার এবং যারা প্রথমবার ভোট দেবেন, তাঁদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তাঁরা সক্রিয়ভাবে এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেন এবং সৎ ও যোগ্য প্রার্থী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সচেতনতা প্রদর্শন করেন।

প্রফেসর ইউনূস তাঁর বক্তব্যের শেষ দিকে জোর দিয়ে বলেন যে, একটি সফল নির্বাচন নিশ্চিত করা কেবল সরকারের একার কাজ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। এই ‘সুপার ক্যারাভান’ কেবল একটি বাহন নয়, এটি মূলত গণতন্ত্রের জয়গান বহনকারী একটি প্রতীক, যা সাধারণ মানুষকে নিষ্ক্রিয়তা ঝেড়ে ফেলে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই উৎসবে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করবে। মূলত স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ এবং জনগণের ক্ষমতায়নের মধ্য দিয়ে একটি নতুন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন ছাত্র-জনতা দেখেছিলেন, ‘ভোটের গাড়ি’র এই যাত্রা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে আরেকটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top