নিরাপত্তা সংকটে ভারতে বাংলাদেশের কনসুলার সেবা স্থগিত: কূটনৈতিক উত্তেজনা চরমে

ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মিশনগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি নজিরবিহীনভাবে বেড়ে যাওয়ায় নয়াদিল্লির হাইকমিশন এবং আগরতলার সহকারী হাইকমিশন থেকে সকল প্রকার কনসুলার সেবা ও ভিসা কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সোমবার (২২ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকবে এবং দিল্লির মিশনের সামনে ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। মূলত মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।

এই চরম সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে গত শনিবার রাতে নয়াদিল্লিতে ঘটে যাওয়া একটি অনভিপ্রেত ঘটনা। চরমপন্থী সংগঠন ‘অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্রসেনা’র একদল সদস্য বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে অবস্থান নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক স্লোগান দেয় এবং ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে সরাসরি হুমকি প্রদান করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, হাইকমিশনারের পরিবার বর্তমানে সেখানে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ঝুঁকির মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। দিল্লির পাশাপাশি শিলিগুড়িতেও একই ধরনের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বিক্ষোভের মুখে ভিসা সেন্টারটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হয় এবং হিন্দুত্ববাদী নেতারা এটি স্থায়ীভাবে বন্ধের হুমকি প্রদান করেন।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতাতেও এই ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে পৌঁছেছে। সোমবার বিকেলে কলকাতার বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের অভিমুখে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে এক বিশাল প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। পুলিশি বাধার কারণে মিছিলটি মিশনের কাছাকাছি পৌঁছাতে না পারলেও বেগবাগান মোড় এলাকায় বিক্ষোভকারীরা দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। শুভেন্দু অধিকারী সেখান থেকে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে, বাংলাদেশে দীপুচাঁদ দাসসহ সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আগামী ২৪ ডিসেম্বর বিভিন্ন সীমান্তে প্রতীকী অবরোধ করা হবে। এমনকি দাবি পূরণ না হলে ওপারে এক কেজি পেঁয়াজও রপ্তানি করতে দেওয়া হবে না বলে তিনি শাসানি দিয়েছেন।

উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে আগামী ২৬ ডিসেম্বর পুনরায় কলকাতায় বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের সামনে বড় ধরনের বিক্ষোভের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একদিকে কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি, অন্যদিকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর মারমুখী অবস্থান—সব মিলিয়ে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এক অস্থির সময় বিরাজ করছে। এই নিরাপত্তা সংকটের কারণে সাধারণ যাত্রী ও সেবাগ্রহীতারা চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন, যার সমাধান কবে নাগাদ হবে তা নিয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট আভাস পাওয়া যায়নি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top