ট্রাম্পের অভিবাসন দমননীতি ২০২৬: বিপুল বরাদ্দ ও ব্যাপক ধরপাকড়ের নতুন ছক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী ২০২৬ সালকে সামনে রেখে অভিবাসন বিরোধী অভিযানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই কঠোর দমননীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি বিলিয়ন ডলারের নতুন তহবিল বরাদ্দ, কর্মস্থলে অভিযানের পরিধি বৃদ্ধি, নতুন আটককেন্দ্র স্থাপন এবং হাজার হাজার অতিরিক্ত এজেন্ট নিয়োগের এক উচ্চাভিলাষী রূপরেখা তৈরি করেছেন। মূলত ২০২৯ সাল পর্যন্ত অভিবাসন ও সীমান্ত সুরক্ষা সংস্থাগুলোর জন্য প্রায় ১৭০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল ব্যয় প্যাকেজ ইতিমধ্যে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস পাস করেছে, যা সংস্থাগুলোর বর্তমান ১৯ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক বাজেটের তুলনায় বহুগুণ বেশি। প্রশাসনের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই বাড়তি অর্থ ব্যবহার করে কেবল অপরাধী নয়, বরং বৈধ কাগজপত্রবিহীন সাধারণ অভিবাসীদের খুঁজে বের করতে তারা বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে কাজ করবেন।

তবে ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক কৌশল মার্কিন জনমনে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবল অস্থিরতা তৈরি করছে। বিশেষ করে আবাসিক এলাকাগুলোতে মুখোশধারী ফেডারেল এজেন্টদের অভিযান, টিয়ার গ্যাসের ব্যবহার এবং এমনকি মার্কিন নাগরিকদের ভুলবশত আটকের মতো ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাব সরাসরি রাজনৈতিক ফলাফলেও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। প্রায় তিন দশক পর মিয়ামি শহরে একজন ডেমোক্র্যাট মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন, যাকে বিশ্লেষকরা প্রেসিডেন্টের বিতর্কিত অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে জনগণের তীব্র প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। মধ্যপন্থী রিপাবলিকান থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটারদের অনেকেই এখন এই অভিযানকে কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং মানবাধিকার ও সংবিধানের চরম লঙ্ঘন এবং আবাসিক এলাকাগুলোর সামরিকীকরণ হিসেবে বিবেচনা করছেন। ফলে জনমত জরিপেও ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির অনুমোদনের হার ৫০ শতাংশ থেকে কমে ৪১ শতাংশে নেমে এসেছে।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ট্রাম্প প্রশাসন জনসম্মুখে অপরাধী দমনের কথা বললেও বাস্তবে তারা নথিপত্রহীন সাধারণ মানুষের ওপরই বেশি চড়াও হচ্ছে। গত নভেম্বরের তথ্যমতে, আটককৃতদের মধ্যে প্রায় ৪১ শতাংশেরই অভিবাসন সংক্রান্ত ছোটখাটো লঙ্ঘন ছাড়া অন্য কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না, যা বছরের শুরুর দিকে ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। প্রেসিডেন্ট প্রতি বছর ১০ লাখ মানুষকে নির্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও চলতি বছর এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ লাখ ২২ হাজার ব্যক্তিকে দেশছাড়া করা হয়েছে। এর পাশাপাশি হাইতিয়ান, ভেনেজুয়েলান ও আফগান অভিবাসীদের জন্য থাকা বিশেষ বৈধ মর্যাদাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে, যা নির্বাসনযোগ্য মানুষের সংখ্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ট্রাম্পের এই অভিযান এখন আর কেবল অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বৈধ অভিবাসীদেরও স্পর্শ করছে। গ্রিন কার্ডের সাক্ষাৎকারে যাওয়া মার্কিন নাগরিকদের স্ত্রীদের গ্রেপ্তার করা, নাগরিকত্ব লাভের চূড়ান্ত মুহূর্তে অনেককে আটক করা এবং হাজার হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিলের মতো ঘটনাগুলো নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। হোয়াইট হাউসের বর্ডার জার টম হোম্যান একে একটি ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে দাবি করলেও, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই মারমুখী কৌশল ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top