চূড়ান্ত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’, শুক্রবার স্বাক্ষর: গণভোটের সময় নিয়ে অনড় দলগুলো, সংকট নিরসনে সরকারের বৈঠক

বহু প্রতিক্ষিত জুলাই জাতীয় সনদ রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক আলোচনার পর চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই সনদের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক চর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সনদে স্বাক্ষর করবেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

আট মাসের উত্তপ্ত আলোচনা, অনড় অবস্থান বাস্তবায়নে

প্রায় আট মাস ধরে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মোট ৩০টি রাজনৈতিক দল জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ধারাবাহিক বৈঠকে অংশ নেয়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় আদর্শগত মতবিরোধ, উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় এমনকি ওয়াকআউটের (বিএনপি, বাম দল) মতো ঘটনা ঘটলেও, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সব পক্ষ এক ছাদের নিচে কাজ করেছে। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ একে ‘জাতির জন্য মাইলফলক’ বলে অভিহিত করেছেন।

তবে, শেষ মুহূর্তেও সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে দলগুলোর মধ্যে চূড়ান্ত ঐকমত্য হয়নি। বিরোধের প্রধান জায়গা:

  • এক পক্ষের দাবি, ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোটের মাধ্যমে সনদের আইনি ভিত্তি দিতে হবে।
  • অন্য পক্ষের মতামত, নির্বাচনের দিনে আলাদা ব্যালটে গণভোট দিতে হবে।

এমন বাস্তবতায় ঐকমত্যের জন্য কমিশনের সভাপতি ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বুধবার (১৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। যদিও বৈঠকের পরও বেশ কয়েকটি দলের নেতারা নিজেদের দাবিতে অনড় অবস্থান বজায় রাখার কথা জানান।

সনদে ৮৪ সংস্কার প্রস্তাব, কমিশনের হাতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

সনদের চূড়ান্ত ভাষ্য অনুযায়ী, এতে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দলগুলোর মত-দ্বিমত এমনকি কিছু বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ সহ সনদটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে:

  • ৪৭টি সিদ্ধান্ত: যা বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন হবে।
  • ৩৭টি সিদ্ধান্ত: যা অধ্যাদেশ ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যাবে।

তবে, কমিশন সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে কোনো সুপারিশ না করায়, গণভোট কবে হবে সেই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন অন্তর্বর্তী সরকারের হাতেই। বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন সেলিম অভিযোগ করেছেন, বিরোধীরা নির্বাচন ঠেকানোর লক্ষ্যে ‘একটি রাজনৈতিক সিন্ডিকেট’ তৈরি করেছেন।

স্বাক্ষর অনুষ্ঠান ও আমন্ত্রণে বিতর্ক

শুক্রবার দক্ষিণ প্লাজার বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে মূলত জুলাই সনদের পক্ষের দলগুলোকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ তাদের সমমনা ১৪ দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এছাড়া কিছু নিবন্ধিত দলকেও আমন্ত্রণ না জানানোর অভিযোগ উঠেছে।

উল্লেখ্য, বিদ্যমান সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সভাপতি করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়েছিল। একাধিকবার মেয়াদ বৃদ্ধির মাধ্যমে কমিশন এই চূড়ান্ত সনদ প্রস্তুত করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top